Mamata Banerjee: ‘জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেপ্তার করা হোক’, কমিশনের অন্দরের সংঘাত প্রকাশ্যে আসতেই বাংলায় পুনর্নির্বাচনের দাবি মমতার
KOLKATA: Mamata Banerjee বা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার সরাসরি জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং খোদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন ও বিস্ফোরক অভিযোগ এনে গোটা জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল ফেলে দিয়েছেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে যখন প্রকাশ পায় যে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই মেগা সংঘাত চলছে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Gyanesh Kumar) বিরুদ্ধে দুই কমিশনার ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন, ঠিক তার পরপরই এই নিয়ে সরব হলেন মমতা। বুধবার এক হাই-ভোল্টেজ সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি সরাসরি জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে গ্রেপ্তারি এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের কড়া দাবি জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি এবং কারসাজির অভিযোগ তুলে তিনি অবিলম্বে পুরনো ভোটার তালিকা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে পুনরায় মেগা বিধানসভা নির্বাচনের (Repoll) দাবিও তুলেছেন, যা রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের ঝড় তুলেছে।

সাংবাদিক সম্মেলনে অত্যন্ত কড়া মেজাজে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক সংস্থায় এমন মেগা কেলেঙ্কারির ঘটনা আমরা আমাদের জীবদ্দশায় আগে কখনও দেখিনি। এই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদে থাকার আর কোনো নৈতিক অধিকার অবশিষ্ট নেই। যদি তাঁর বিন্দুমাত্র সম্মান বা বিবেক বলে কিছু থেকে থাকে, তবে তাঁর উচিত নিজেই নিজের গ্রেপ্তারি দাবি করা।” তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন আর একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে কাজ করছে না, বরং তারা সম্পূর্ণভাবে শাসকদল বিজেপির একটি রাজনৈতিক শাখায় পরিণত হয়েছে। মমতা দাবি করেন যে, কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রেগুলেশন’ বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে ভোটার তালিকা থেকে বিরোধী ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে বিজেপির প্রতি সহানুভূতিশীল ভুয়া ভোটারদের নাম ঢোকানো হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটির পেছনে জ্ঞানেশ কুমার এবং বিজেপির আইটি সেলের মেগা হাত রয়েছে বলে তিনি প্রকাশ্যেই অভিযোগ তুলেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বিস্ফোরক দাবি করে বলেন, “আমরা এতদিন ধরে যে অভিযোগ করে আসছিলাম, আজ কমিশনের অন্দরের খবর প্রকাশ্যে আসতেই তা সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল। জ্ঞানেশ কুমার শুধুমাত্র পুলিশকে অপব্যবহার করেননি, তিনি বিজেপির সঙ্গে সম্পূর্ণ গোপন আঁতাত করে কমিশনের সর্বত্র বিজেপি-মনস্ক আমলা এবং ইআরও (ERO)-দের নিয়োগ করেছেন।” প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া আক্রমণ শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে না, বরং এটি গোটা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিতকেই নাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মমতার মতে, বিজেপি এবং জ্ঞানেশ কুমার যৌথভাবে বাংলার মানুষের ভোটাধিকার চুরি করেছেন। তাই তিনি জোর গলায় দাবি করেন যে, এই ত্রুটিপূর্ণ এবং কারচুপি করা নতুন ভোটার তালিকা বাতিল করতে হবে এবং অবিলম্বে পুরোনো ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গে পুনরায় নির্বাচন বা রিপোলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মেগা আক্রমণের রেশ ধরে অন্যান্য বিরোধী দলগুলিও এবার কমিশনের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে শুরু করেছে। বিহারের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী তেজস্বী যাদবও নির্বাচন কমিশনের এই অভ্যন্তরীণ রিপোর্টকে ‘চাঞ্চল্যকর’ বলে উল্লেখ করে বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ার আড়ালে যে বড়সড় রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল বা দুর্নীতি হয়েছে, তা নিয়ে অবিলম্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই গ্রেপ্তারি দাবির পর বিজেপির তরফ থেকেও কড়া প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে। বিজেপি নেতারা দাবি করেছেন যে, নির্বাচনে পরাজয়ের পর হতাশা থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক সংস্থাকে সরাসরি আক্রমণ করছেন। বিজেপির দাবি, যদি সত্যিই বিরোধী ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হতো, তবে এই এসআইআর প্রক্রিয়ার পর বেশ কয়েকটি আসনে বিরোধীরা কীভাবে এত ভোট পেল?
এই মেগা বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করেছে। কমিশনের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে, তাদের সমস্ত সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশিকা সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া মেনেই নেওয়া হয়েছে এবং তা সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনেই করা হয়েছে। খসড়া পর্যায়ে কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য বা ভিন্ন মতামত থাকাটা যেকোনো গণতান্ত্রিক এবং বহুমাত্রিক সংস্থার একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। একে কোনোভাবেই ‘সংঘাত’ বা ‘বেআইনি’ কাজ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায় না। নির্বাচন কমিশন তাদের বিবৃতিতে আরও জানিয়েছে যে, এসআইআর প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও বেশি উন্নত করা। তবে নির্বাচন কমিশনের এই সাফাই সত্ত্বেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘গ্রেপ্তারির দাবি’ এবং ‘পুনর্নির্বাচন’-এর হুঙ্কার যে আগামী দিনে জাতীয় স্তরের রাজনীতিতে এক বিরাট বড় ইস্যু হতে চলেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।




