Nandigram Rejinagar Bypoll NOTA: জোড়াফুল প্রতীক ছাড়া খামে কত ভোট পেলেন এহতেশামুল ও হাবিব মাস্টার?
Kolkata: রাজ্যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই প্রথমবার জোড়া উপনির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিল রাজ্যের সমস্ত যুযুধান রাজনৈতিক দল। কয়েক মাস আগের সেই পালাবদলের পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ যে কতটা বিস্তরভাবে বদলে গিয়েছে, তার এক অত্যন্ত নগ্ন এবং বাস্তব ছবি ফুটে উঠল এবারের উপনির্বাচনের ভোট গণনায়। বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেসের আড়াআড়ি বিভাজনের পর এটি ছিল উভয় শিবিরের কাছেই এক বড়সড় অ্যাসিড টেস্ট। উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের কড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী এই উপনির্বাচনে কোনো দলকেই ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম অথবা তাদের সেই চিরপরিচিত ঘাসের ওপর জোড়াফুল প্রতীকটি ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এর ফলে সম্পূর্ণ নতুন নাম এবং নতুন প্রতীক নিয়ে বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করার এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন বিভক্ত তৃণমূলের নেতারা।
এই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর—এই দুই হাইভোল্টেজ কেন্দ্রেই নিজস্ব প্রার্থী দিয়েছিল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস, যা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ‘ঋতব্রত তৃণমূল’ নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছে। দলের প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরে নিজেদের নতুন প্রতীক ‘খাম’-এ ভোট দেওয়ার জন্য জোরদার প্রচার চালিয়েছিলেন। অন্যদিকে, মমতা তৃণমূল কংগ্রেস এই উপনির্বাচনে সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে নন্দীগ্রামে সরাসরি কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু শুক্রবার সকাল থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে এই দুই কেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর থেকেই যে ট্রেন্ড বা প্রবণতা সামনে আসতে শুরু করে, তা ঋতব্রত শিবিরের জন্য এক চরম হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। গণনাকেন্দ্রের লাইভ আপডেট অনুযায়ী, বিজেপি বা কংগ্রেসের মতো প্রধান বিরোধী দলগুলির সঙ্গে লড়াই করা তো দূরের কথা, গণতান্ত্রিক তৃণমূলের প্রার্থীরা আক্ষরিক অর্থেই নোটার (NOTA) সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন।
পূর্ব মেদিনীপুরের হেভিওয়েট আসন নন্দীগ্রামের ভোট গণনার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই করুণ চিত্রটি একেবারে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ১৫ রাউন্ডের ভোট গণনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১২ রাউন্ডের গণনা শেষ হওয়ার পর দেখা যায় যে, ঋতব্রত তৃণমূল অর্থাৎ গণতান্ত্রিক তৃণমূলের প্রার্থী এহতেশামুল হক নিজের ‘খাম’ প্রতীকে মাত্র ৬৬৯টি ভোট নিজের ঝুলিতে ভরতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে, তাঁর চরম প্রতিদ্বন্দ্বী তথা বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী হাসিরানি রথ ইতিমধ্যেই ১ লক্ষ ৩২ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে এক অপ্রতিরোধ্য ব্যবধানে প্রথম স্থানে রয়েছেন। অর্থাৎ, প্রথম স্থানে থাকা বিজেপি প্রার্থীর সঙ্গে ঋতব্রত শিবিরের প্রার্থীর ভোটের ফারাক এতটাই বিস্তর যে তা দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও মাপা সম্ভব নয়। বরং এই কেন্দ্রে নোটা বা ‘নান অফ দ্য অ্যাবাভ’ অপশনে ভোট পড়েছে মোট ৫৫০টি। ফলে গণতান্ত্রিক তৃণমূলের প্রার্থীর মূল টক্কর এখন চলছে এই নোটার সঙ্গেই।
শুধুমাত্র নন্দীগ্রামেই নয়, মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেজিনগর কেন্দ্রের ভোট গণনার ছবিতেও একই রকম হতাশার সুর ফুটে উঠেছে ঋতব্রত শিবিরের জন্য। রেজিনগর কেন্দ্রে ঋতব্রত তৃণমূলের হয়ে ‘খাম’ প্রতীকে নির্বাচনী ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন সফিউজ্জামান শেখ, যিনি স্থানীয় মানুষের কাছে হাবিব মাস্টার নামেই সমাধিক পরিচিত। কিন্তু ইভিএম (EVM) মেশিনের সিল খোলার পর দেখা যায় যে, এখানেও তাঁর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, রেজিনগরে মোট ১৫ রাউন্ডের মধ্যে ৭ রাউন্ডের গণনা সম্পন্ন হওয়ার পর সফিউজ্জামান শেখ বা হাবিব মাস্টার পেয়েছেন মাত্র ৯৩২টি ভোট। অথচ এই কেন্দ্রটিতে প্রথম স্থানে থাকা বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার ইতিমধ্যেই ৬১,৩৮৬টি ভোট পেয়ে বিরোধীদের সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছেন। এখানে কংগ্রেস, মমতা তৃণমূল এবং আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থীরাও হাবিব মাস্টারের থেকে যোজন দূরে এগিয়ে রয়েছেন।
Humayun Kabir Arrest: ‘পুলিশ ভোট করিয়েছে’, ১২ ঘণ্টা পর থানা থেকে বেরিয়েই বিস্ফোরক হুমায়ুন
রেজিনগর কেন্দ্রে এখনও পর্যন্ত নোটা (NOTA) বা কাউকেই পছন্দ নয় অপশনে মোট ২৪৮টি ভোট পড়েছে। যদিও এই সংখ্যাটি হাবিব মাস্টারের প্রাপ্ত ভোটের থেকে কিছুটা কম, তবুও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট যদি নোটার আশেপাশেই ঘোরাফেরা করে, তবে তা সেই দলের জনভিত্তির ক্ষেত্রে এক চরম অশনিসংকেত। রাজ্যের দুটি ভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত এমন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্রে যেখানে সাধারণ মানুষ নোটার বোতাম টেপাকেই বেশি শ্রেয় বলে মনে করছেন, সেখানে ঋতব্রত তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হলো। রাজনৈতিক মহলের মতে, জোড়াফুল প্রতীক ছাড়া এবং সঠিক রাজনৈতিক দিশার অভাবে সাধারণ মানুষ যে এই নতুন বিভক্ত গোষ্ঠীকে একেবারেই গ্রহণ করেননি, উপনির্বাচনের ব্যালট বাক্সে সেটাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো। খামে যে বাংলার মানুষ প্রত্যাশিত ভোট ভরেননি, তা এখন দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।



